বিশ্ব ডাক দিবস আজ

যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি ডাক বিভাগ, হাজার কোটি টাকা ব্যয়েও ফেরেনি আস্থা

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বড়হরে অবস্থিত অবিভাগীয় শাখা পোস্ট অফিস। সামনেই পুরনো পোস্ট বক্স। রোদ-বৃষ্টিতে রঙ উঠে গেছে, তালায় ধরেছে মরিচা। কতদিন ধরে খোলা হয়নি, তার হিসাব নেই।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বড়হরে অবস্থিত অবিভাগীয় শাখা পোস্ট অফিস। সামনেই পুরনো পোস্ট বক্স। রোদ-বৃষ্টিতে রঙ উঠে গেছে, তালায় ধরেছে মরিচা। কতদিন ধরে খোলা হয়নি, তার হিসাব নেই। এ ডাকঘরে ১৭ বছর ধরে পোস্টম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আমিনুল ইসলাম। জানালেন, দীর্ঘ কর্মজীবনে একটি চিঠিও আসেনি। মাঝে মাঝে পরিষ্কারের জন্য বক্সটি খোলা হয়। শুধু বড়হর নয়, দেশের অধিকাংশ পোস্ট অফিসের চিত্র এমনই। একসময় চিঠি, টাকা-পয়সা, দলিলপত্র পাঠানোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ছিল এ ডাক। কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি এখন বিলুপ্তির পর্যায়ে।

পোস্টম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আগে পোস্ট বক্সে মানুষ চিঠি ফেলত। তথ্য পাঠানোর মাধ্যম আধুনিকায়ন হওয়ায় এখন তার প্রচলন নেই। যদিও দাপ্তরিকভাবে কিছু কাজ আছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন বাদে গড়ে ১০-১৫টি চিঠি বিলি করতে হয়। যেগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক, এনজিও ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আইনি নোটিস ও বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক-সংক্রান্ত নোটিসই বেশি।’

ডাক বিভাগটি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরকারের একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। ঐতিহ্যবাহী ডাক শুধু হারিয়ে যাচ্ছে না, আর্থিকভাবেও সরকারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাক অধিদপ্তরের তথ্যমতে ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাতে সরকার ব্যয় করেছে ৪ হাজার ৭০২ কোটি টাকা। বিপরীতে রাজস্ব আয় মাত্র ১ হাজার ৪১৯ কোটি। অর্থাৎ পাঁচ বছরে ডাক বিভাগের পেছনে সরকারের লোকসান ৩ হাজার ২৮৩ কোটি টাকার বেশি। সবশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত প্রতিবেদন সংস্থাটির ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেবার মান না বাড়ানো, আধুনিকায়ন না করা, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে লাগামহীন দুর্নীতির কারণে ডাক বিভাগ এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে। বিগত সরকার আমলে ডাক বিভাগের উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় টাকার খরচ হলেও সেবার দিক দিয়ে তেমন উন্নতি হয়নি।

২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ১৮৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। ভাতা বাবদ ব্যয় হয়েছে ৯৭৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর পেনশন ও আনুতোষিক ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ বেতন, ভাতা, পেনশন ও আনুতোষিক ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৬৯৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা।

বিগত বছরে আওয়ামী সরকার ডাক বিভাগে অবকাঠামো উন্নয়ন, এমপিসি প্রকল্প, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনসহ বেশকিছু প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। যদিও এ বিপুল পরিমাণ ব্যয় ডাক বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে পারেনি। এর মধ্যে ২০২১ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে ৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে ডাক ভবন উদ্বোধন করা হয়। ডাক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য ২০১৯ সালে ৩৭৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ‘ঢাকা শহরে ডাক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ’ প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। ডাক ব্যবস্থাকে আধুনিক ও গতিশীল করতে ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে ৩৬৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৪ জেলায় মেইল প্রসেসিং ও লজিস্টিক সার্ভিস সেন্টার (এমপিসি) প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। এছাড়া ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক ডাকঘর তৈরির প্রকল্প নেয় ডাক অধিদপ্তর। এ প্রকল্পেও ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) শুধাংশু শেখর ভদ্র ও ডেপুটি পোস্ট মাস্টার জেনারেল মোস্তাক আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় এ দুজন গ্রেফতারও হন।

সিরাজগঞ্জ ও চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় ডাকঘরগুলো সরজমিন দেখা গেছে, সেখানে তেমন কোনো কর্মচঞ্চলতা নেই। মিরসরাই উপজেলা ডাকঘরে গিয়ে দেখা যায়, সেবাগ্রহীতার চেয়ে সেখানে কর্মকর্তাই বেশি। দুই-একজন গ্রাহক সঞ্চয়পত্রের লেনদেন করতে এসেছেন। উপজেলার আবুতোরাব ডাকঘরের মাস্টার গোপাল চন্দ্র নাথ বলেন, ‘এখন বিবাহবিচ্ছেদ ও ব্যাংকের চিঠি বেশি আসে। এছাড়া মিরসরাই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কিছু চিঠি আসে। ব্যক্তিগত চিঠি, কাগজপত্র এসব একেবারেই আসে না বললেই চলে।’

আগে মানি অর্ডারের পরিমাণ বেশি থাকলেও বিকাশ, নগদ ও ব্যাংকিং লেনদেনের কারণে এখন তেমন একটা মানি অর্ডার হয় না বলেও জানান ডাকের এক কর্মকর্তা। তবে অনলাইন শপ দারাজের সঙ্গে ডাক বিভাগের চুক্তি হওয়ায় কিছু পার্সেল ডাকঘরগুলোয় আসতে দেখা গেছে। কর্মচাঞ্চল্যতা না থাকায় মাঝে মাঝে উপডাকঘরগুলো বন্ধ থাকে। কার্যক্রম না থাকায় ডাকপিয়নরা নিয়মিত থাকেন না।

সার্বিক বিষয়ে ডাক অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) আল মাহবুব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের বড় জনবল কাঠামো রয়েছে। তাদের পেছনে বড় অংক ব্যয় করতে হয়। সরকার এ বিভাগকে রেখেছে মানুষের সেবার জন্য, আয়ের জন্য নয়। সেজন্য আয় ও ব্যয় দিয়ে এটিকে মূল্যায়ন করা যাবে না। কুরিয়ারগুলো ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে মুনাফা করতে পারে। কিন্তু ডাক বিভাগ ১০ পয়সা দাম বাড়ালেও প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত অনুমতি লাগবে। এখানে সেবাই মুখ্য।’ তিনি আরো বলেন, ‘ব্যক্তিগত ও পারিবারিক চিঠি বন্ধ হয়ে গেছে। বিপরীতে কমার্শিয়াল চিঠি এখন বেড়েছে। আমরা সেবার মান বাড়াচ্ছি। আগে আমাদের চিঠিগুলো ট্র্যাক করা যেত না। চিঠি পৌঁছালে তারা জানতে পারত। এখন ট্র্যাক করা যাচ্ছে। এমন কিছু আধুনিকায়ন আমরা করেছি। সেবার মান আরো আধুনিকায়নে কাজ চলছে।’

আরও